দৈনিক ২৫ টাকা হাজিরার রাসেল (একজন সফল ফ্রিল্যান্সার)
একজন সফল ফ্রিল্যান্সারের জীবনী
রাসেল আহমেদ। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার ফারাকপুর গ্রামে বাড়ি আমার। পরিবারের সবার মধ্যে আমিই বড়। আমার বাবা পেশায় দর্জি। তখন সংসার চালানোর পাশাপাশি আমার পড়াশোনার খরচ চালাতে বাবা হিমশিম খাচ্ছিলেন। দারুণ অর্থকষ্টে দিন কাটাচ্ছিলাম। আমার মনে আছে এস.এস.সি পরীক্ষার ফরম পূরণের ৯০০ টাকা জোগাড় করার জন্য আমি প্রায় ১ মাস পড়াশোনা ছেড়ে ২৫ টাকা করে দিনে মাঠের মধ্যে সারাটা দিন ধরে নিড়ানি দিতাম, মাটি কাটতাম। অনেক কষ্টে ৯০০ টাকা জোগাড় করে আমি এসএসসি পরীক্ষা দেই। আমার আজও মনে আছে অংক পরীক্ষার দিন আমার পায়ের পুরাতন সেন্ডেলটি ছিড়ে গিয়েছিলো। পকেটে টাকা না থাকায় আমি খালি পায়ে পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরেছি।
ছোটবেলা থেকেই আমার ছিল প্রযুক্তির প্রতি দৃর্নিবার আকর্ষণ। আমাদের টিভি ছিল না কিন্তু পাড়ার কোথাও টিভি কিনে আনলে আমাকে ডাকতো তার চ্যানেলগুলো ঠিক করাতে। ক্যালকুলেটর টিপে টিপে আমি এগুলো শিখেছিলাম। এত অভাবের মধ্যে আমার নেশা ধরলো কম্পিউটার শিখব। আমার এক বন্ধুর সেনাবাহীনিতে চাকরি হয়ে গেল। সে কম্পিউটার জানত। আমি বাড়িতে বোঝালাম কম্পিউটার শিখলে আমারও চাকরি হবে। কিন্তু তখন কম্পিউটার শিখতে প্রায় ৩০০০ টাকা লাগবে।
এই টাকার কথা শুনে আমার শেখার ইচ্ছেটাই মরে যায়। কিন্তু আমার মা, যিনি শত অভাবের মধ্যেও আমাদের সংসারটা টিকিয়ে রেখেছিলেন। তিনি আমাকে ৩০০ টাকা দিয়ে বললেন ভর্তি হয়ে এসো আমি আমার কানের দুল, হাতের চুড়ি বিক্রি করে হলেও তোমাকে কম্পিউটাল শেখাবো। আমি ভর্তি হয়ে আসলাম। সেই সেন্টারে কম্পিউটার শেখার সময় আমি খুব মনযোগ সহকারে শিখতে লাগলাম। অন্যদের চেয়ে আমি ভালো করতে লাগলাম। এরই মধ্যে আম্মু আমাকে আরো কিছু টাকা দিলেন সেই প্রতিষ্ঠানে জমা দেবার জন্য। এদিকে আমার শেখার তিন মাস সময় প্রায় শেষ হয়ে আসছে। কিন্তু আমার টাকা দেওয়া হয়নি। টাকা দিয়ে আমাকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে তারপর সার্টিফিকেট নিতে হবে। কিন্তু আমি টাকা দিতে পারিনি। তাই পরীক্ষা দেবার সুযোগ হয়নি।
আমার কাজ দেখে প্রতিষ্ঠান প্রধান আমাকে তার দোকানে চাকুরির জন্য বললেন। আমি যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে গেলাম। সারাদিন দোকানের কাজের পর আমি কম্পিউটারে অন্যসব কাজ অনুশীলন করি। আমি সবকিছু একেবারে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতাম। এভাবে আমি সেখানে চাকরি করতে থাকি। আমার বেতন ছিল মাসে ১০০ টাকা। আমি এই বেতনে সন্তুষ্ট ছিলাম। আসলে আমার কম্পিউটারের পাশে থাকার ইচ্ছেটাই বেশি ছিল।
আমি কম্পিউটার দোকানের চাকুরি করি ২ বছর। আমার বেতন বেড়ে ১০০০ হয়েছিল। আমার নানার এক বন্ধুর একটি দোকান আমি ভাড়া পেয়ে যাই। কিন্তু ব্যবসা করার টাকা আমার ছিল না।
একটু বলে রাখি আমার তেমন কোন বন্ধু-বান্ধবের সাথে মেশার অভ্যেস ছিল না। কম্পিউটার ছিল আমার একমাত্র বন্ধু। ঈদের দিন ও আমি কম্পিউটারের সাথে কাটাতাম। এজন্য আমার তেমন কোন হাতখরচ ছিল না। তাই আমার বেতনের টাকাটা আমি জমাতাম। এমনি করে ৫০০০ টাকা জমেছিল। কিন্তু সেই দোকানটি নিতে হলে ৫০০০ টাকা সিকিউরিটি দিতে হবে। তখন ৫০০০ টাকা দিয়ে দোকান পাওয়া একটি ভাগ্যের ব্যাপার। কারন আশেপাশে ১ লক্ষ টাকা দিয়ে দোকান নিতে হত। তাই আমি আমার জমানো টাকা দিয়ে দোকানটি নিয়ে নিলাম।
কিন্তু ব্যবসা করতে তো টাকা লাগবে। আমার কাছে টাকা ছিল না আর। কিন্তু আমার মা আছেন না? তিনি আমাকে আবারও তার কি যেন বিক্রি করে ১০ হাজার টাকা দিলেন। সেই ১০ হাজার টাকা দিয়ে আমি একটি পুরাতন পেন্টিয়াম থ্রি কম্পিউটার কিনি। যার হার্ডডিস্ক ছিল ১০ গিগা, র্যাম ছিল ৬৪ মেগাবাইট, প্রসেসর ছিল মাত্র ৫০০ মেগাহার্জ।
আমি ধার করে একটি প্রিন্টার কিনি। আর কার্ড রিডার কিনে মোবাইলে গান তোলা ও কম্পোজ করার কাজ করতে তাকি। এরই মধ্যে একটি দোকান থেকে ক্যামেরা ভাড়া করি। প্রতি ফ্লাসে ৫ টাকা করে দিতে হত। এভাবে আমার ব্যবসা চলতে থাকে। বাবা-মা এর দোয়ায় আমি প্রথম দিন ৮০ টাকা রোজগার করি। আস্তে আস্তে অনেক পরিশ্রম করে ব্যবসা করে আমি একসময় ৫ টি কম্পিউটার, ফটোস্ট্যাট মেশিন, ফ্যাক্স, লেজার প্রিন্টার ইত্যাদির মালিক হই। আমি শুক্রবারেও দোকানে যেতাম।
ইতিমধ্যেই আমি ইন্টারনেটে আসক্ত হই। সিটিসেলে প্রিপেইড প্যাকেজ ছিল আমার প্রতি মিনিট ৪০ পয়সা করে। আমি নেটে বিভিন্ন আউটসোর্সিং এর কথা জানতে পারি। বিভিন্ন কাজ শিখি আমি। কিন্তু কখনো আউটসোর্সিং কে পেশা হিসেবে নেব বলে কল্পনা করিনি। আমি বিভিন্ন কাজ যেমন জুমলা, ওয়ার্ডপ্রেস, পানবিবি, এইচটিএমএল ইত্যাদির কাজ শিখি।
এর মধ্যে উপজেলায় ই-সেন্টার এর জন্য লোক নিয়োগ করা হবে বলে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখি। আবেদন করি। উপজেলা নির্বাহী অফিসে আমি ইন্টারভিউ দিয়ে টিকে যাই। ই-সেন্টারে কাজ করতে থাকি।
আমার জীবনের এই উত্থানের সাথে ছিলেন আরেকজন। তিনি হলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ রাজিবুল ইসলাম। তিনি প্রযুক্তি সম্পর্কে ব্যপক আগ্রহী। আমি তার মনযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হই।
আমি নিজেকে নিয়ে কখনোই আতœবিশ্বাসী ছিলাম না। ভাবতাম কবে যে আমার একটি সরকারী চাকুরী হবে! একদিন উপজেলা নির্বাহী অফিসে আমার ছবি সত্যায়িত করার জন্য গেলে স্যার আমাকে বলেন কেন ছবিটি সত্যায়িত করছি। আমি বলি চাকুরীর জন্য। তিনি আমাকে অনেক বোঝান। বলেন যে, আমার মত ছেলে সামান্য ৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করবে না। তিনি আমাকে আতœবিশ্বাসী করে তোলেন। তিনি আমাকে ৬ মাস অপেক্ষা করতে বলেন। আর বলেন যে, চেষ্টা করতে থাকো অনেক কিছুই পাবে। তিনি আমাকে অনলাইনে আয় এর সম্ভাবনা ও বিভিন্ন পরামর্শ দেন।
আমি আবার চেষ্টা করতে থাকি। খুলনাতে থাকাকালীন আমি আমার বন্ধুদের অনুরোধে ওডেস্কে বিড করি। প্রথম বিডেই আমি কাজ পেয়ে যাই। এবং কাজটা সফলভাবে সম্পন্ন করি। সেখান থেকেই আমার কিছু ভাল মানুষের সাথে পরিচয় হয়। যারা আমাকে কাজ দিতে থাকেন। সফলভাবে ও দ্রুততম সময়ে কাজ শেষ করার কারনে আমি রেটিং ভালো পাই। তারপর থেকে আমাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
ঘরে ফেরার সিদ্ধান্ত
অনলাইনে আমি প্রথম মাসে ইনকাম করি ২৭০০০ টাকা। যা আমার জন্য ছিল বিরাট অংকের। এভাবে যখন আমি প্রতি মাসেই ইনকাম করি এবং ইনকাম যখন একটু একটু করে বেড়ে যাচ্ছিলো তখন আমি সিদ্ধান্ত নেই আমি আর দোকানে বসব না। কারন দোকানে বসে কাস্টমারের জন্য অপেক্ষা করতে হবে, প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে, তারপর আয় যা আসে তা সেই তুলনায় সামান্য। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম দোকান ছেড়ে দিব।
আমার এই সিদ্ধান্তের কথা শুনে আমি বাড়িতে দারুণভাবে বকা খেলাম। আসলে আমার বাবা-মা তখন জানতেন না এটি কি সম্ভাবনা। তারপর আমি তাদের বোঝালাম। দোকানে না গিয়ে আমি ইনকাম করে দেখালাম। তারা একটু একটু বুঝতে পারল। কিন্তু আমার আশেপাশের প্রতিবেশী বলাবলি করা শুরু করল, আমার অসুখ হয়েছে, আমি ঘরে বসে নেশা করি, কেউ কেউ বলল আমি পাগল হয়ে গেছি! ইত্যাদি। কিন্তু আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল। আমি সবসময়ই চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করি। আমি বলতে পারি আমি তখনকার চাইতে অনেক অনেক ভালো আছি। আমার গত মাসের আয় ১,২০,০০০/= টাকা। এ মাসে একটু কম ৯০,০০০/= টাকার মত।
আমার ভবিষ্যত পরিকল্পনা
আমি প্রথম দিকে একাই কাজ করতাম। প্রচুর কাজ আসাতে আমি অনেক কাজ ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু পরে ভাবলাম আমি একটা টিম করি। তাই আমি টিম করি এবং এখন আমি কাজ পেলে আমার টিমে ভাগ করি। আমার টিমে সদস্য সংখ্যা ৪ জন। বাড়বে আস্তে আস্তে।
আয় করার পাশাপাশি আমি ফ্রিতে/নামমাত্র মূল্যে আউটসোর্সিং শেখাই যাতে সবাই কিছু না কিছু আয় করতে পারে। বেকার থাকা অনেক কষ্টের তা আমার চেয়ে কেউ ভাল জানে না। আমি আগামী ১ বছরের মধ্যে আমার জেলাকে বেকারমুক্ত করতে চাই। আমি কিছু প্রতিবন্ধীকে কাজ শেখাতে চাই যাতে তারা কারও বোঝা না হয়ে থাকেন। আগামী ১ বছরের মধ্যে আমি ১ হাজার ফ্রিল্যান্সার তৈরি করব যারা প্রতি মাসে আমার মত ১ লক্ষ টাকা করে মাসে ইনকাম করবে। প্রতি মাসে ১০০০ লক্ষ টাকা আয় করবে আমার ওয়ার্কার রা।